নির্বোধের একদিন

ক্লাস শুরু হওয়ার ঘন্টা পড়েছে, স্যার এই এলেন বলে, ঠিক তখনই ক্লাসে হন্তদন্ত হয়ে ঢোকে ভানু। না, ভানু ওই ছেলেটার আসল নাম নয়, ক্লাসের গোটা কয়েক পাকা ছেলেমেয়েদের দেওয়া উপাধি। মাথা নিচু করে, একেবারে কারোর দিকে না তাকিয়ে ভানু নিজের বসার জায়গায় চলে গেল। প্রথম বেঞ্চের একটি মেয়ে তার বান্ধবীকে কনুইয়ের খোঁচা দিয়ে বলে ওঠে, “ওই দেখ, তোর প্রেমিক চলে এসেছে!” কথাগুলো শেষ হতে না হতেই সেই মেয়েটি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। “তোকে মেরে ফেলবো এবার, আবার যদি ঐ ভোঁদড়টাকে আমার বয়ফ্রেন্ড বলিস।” ভানুর কানে ওদের কথাগুলো ঢুকল কিন্তু ও সেগুলো শোনেনি যেন ভাব করে নিজের জায়গার দিকে এগিয়ে গেলো।

কিন্তু তার বসার জায়গা কই, সবটাই তো ওর বন্ধুদের আড্ডার ঠিকানা হয়ে গেছে। যদিও যারা ওর জায়গাটা দখল করেছে তাদের ও বন্ধু বলতে একেবারেই রাজি নয়, বোধহয় উল্টোদিক থেকে বন্ধুত্বের হাত কোনো দিনই এগিয়ে আসেনি বলে। বন্ধুত্ব অনেক দূরের জিনিস, সামান্য সম্মানটাই তো এরা দেয় না তাকে।

“ওই তোরা আমার জায়গাটা ছাড়, বসবো।”

কোনো প্রত্যুত্তর এলো না। সেই ছেলের দল নিজেদের গল্পেই মশগুল।

“কিরে তোরা সর না, ক্লাসে স্যার এসে যাবে এক্ষুণি।”

“দেখতে পাচ্ছিস না ভানু, আমরা কথা বলছি।”

“দেখতে পাচ্ছি বলেই বলেছি। আর আমার নাম ভানু নয়, সূর্য। সূর্য বলেই ডাকবি।”

“বাংলাটাও জানিস না নাকি রে, সূর্যর সমার্থক শব্দ হলো ভানু। তাহলে তোকে ভানু বলতে অসুবিধা কোথায়?”

সূর্য বাকযুদ্ধে বড়োই কাঁচা, তাই আর বাকি ছেলেদের সাথে পেরে উঠলো না। ভানু বলতে যে বাকি ক্লাসের ছেলেমেয়েরা বাংলা সিনেমার ভানু ব্যানার্জীর কমেডির জন্যে তার নাম দিয়েছে, এটা সূর্য নিজে ছাড়া বাকি সবাই জানত। এমনকি ওদের স্কুলের স্যার এদের সামনেও অনেকেই ওকে ভানু বলার সাহস পায়। সূর্য বুঝে উঠতে পারে না ওকে আঘাত করে ঠিক কতটা আনন্দ পায় বাকি মানুষগুলো।

সূর্য চুপ করে আছে দেখে সবাই হেসে উঠলো, যেন তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ জিতে ফিরেছে তারা। তবে সে হাসি ক্ষণস্থায়ী, অংকের স্যার ক্লাসে ঢুকতেই সবাই যে যার জায়গায় ফিরে গেল আর সূর্য পেয়ে গেল নিজের বসার জায়গা। কিন্তু পেলে কি হবে, তাকে তো বসতে হয় ক্লাসের সব থেকে মোটা ছেলেটার পাশে। বেঞ্চে ওর জন্যে প্রায় জায়গাই থাকে না, কোনো রকমে শরীরের অর্ধেকটা বেঞ্চে থাকে আর বাকিটা বেঞ্চের বাইরে। ওদের ক্লাস টিচার, অংকের স্যারকে অনেকবার বলেছে সূর্য ওর বসার জায়গাটা পাল্টে দিতে কিন্তু কোনো বারই উনি রাজি হননি। সূর্যর একটাই যুক্তি, “স্যার, ঋষব যা মোটা, তাতে আমি বসার জায়গা পাইনা।” পুরো ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে সূর্য ওর সহপাঠীকে মোটা বলছে, এটা কখনোই স্যার মেনে নিতে পারতেন না। আর ঋষব ছেলেটা সূর্যের থেকে অংকে চতুর্গুন ভালো, তাই সবার চোখের আড়ালে স্যার ঋষবকে একটু বেশিই স্নেহ করতেন। অগত্যা যখন সূর্য স্যারের স্নেহেরপাত্রকে সর্বসমক্ষে মোটা বলে ‘অপমান’ করলে, স্যারের রাগ হওয়াই যথেষ্ট সঙ্গত। “দেখ সূর্য, প্রত্যেকবার অংকের পরীক্ষায় তুই একশয় ষাটের বেশি তো পাসনা, তো ঋষবের পাশে বসে তুই যদি একটু বেশি শিখতে পারিস, তো লাভটা তো তোর ই, ওর নয়।” সূর্য চুপ করে যায় মায়ের কথা ভেবে, মা ওকে প্রত্যেকদিন স্কুলে আসার আগে পই পই করে বলে দেয়, “স্যারদের মুখের ওপর তর্ক করবি না, যা বলবে কথা শুনবি। আর বন্ধুদের সাথে মারপিট করবি না, জানিস তো ক্রিকেট খেলে খেলে তোর হাতে যা জোর হয়েছে, কাউকে মারলে সে আর বাঁচবে না।” তাই পছন্দ না হলেও, সূর্য ঋষবের পাশেই কোনো রকমে বসে, ওর সাথেও বিশেষ একটা কথা বলে না, ঝগড়া তো দূরে থাক। ও নিজের মতো করে থাকে, একলা একলা ক্লাসের পড়া করতে থাকে, বন্ধু বলতে সেই রকম কেউ নেই, সবকটা ওকে নিয়ে মজা করতে ব্যস্ত। মনে মনে এই ছেলেগুলোর ওপর সূর্যের যথেষ্ট রাগ হলেও ওদের টিরকিরিতে কান দেয় না। স্যারদের কাছে এদের নামে নালিশ করাও বৃথা, উল্টে ওকেই ধমকে দেবে। সব চেয়ে ভালো একা থাকা, নির্ঝঞ্ঝাট জীবন।

ক্লাসের ঘন্টা পড়ে। অংকের স্যার এসে ওদের জ্যামিতির উপপাদ্য পড়াতে শুরু করেন। কালো বোর্ডে চক দিয়ে কিছু আঁকিবুকি কেটে কিসব বোঝাতে থাকেন। সূর্য খাতায় সেই আঁকিবুকির অনুকরণ করে, মাথায় যে কিছুই ঢুকছে না, সে বেশ বুঝতে পারে। অন্যদের দিকে একবার ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখলো, সবাই বেশ মাথা নেড়ে নেড়ে স্যারের সাথে তাল মেলাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন সবই বুঝে যাচ্ছে, এমনকি ওই শুভ নামের বাঁটুল ছেলেটা যে কিনা ক্লাসে লাস্ট হয়। অদ্ভুত এক হীনমন্যতা কাজ করতে শুরু করে সূর্যর মনে। শুধু কি ওই অঙ্ক পারে না, কে জানে! ক্লাসে আর মন বসছে না, তাই নিজের অজান্তেই সূর্যর চোখ চলে যায় কোনের বেঞ্চে রাই এর দিকে। বড্ড সুন্দর ওর ঠোঁটের কোণে তিলটা, ভগবান এত রূপ ওকেই কেন দিলো, উফফ আর সহ্য করা যায় না! তাই চোখ সরিয়ে নিল রাইএর থেকে। নিজের খাতার কোনে কাটাকুটি খেলতে খেলতে আর রাই এর সুন্দর মুখটার কথা ভাবতে ভাবতে সূর্য মুচকি হেসে ফেলে। হাসিটা ছোট্ট হলেও পাশের বেঞ্চের সৃজন দেখে ফেলে বলে ওঠে: “শালা, খ্যাপা!” কথাটা কানে যেতেই সূর্যের মাথা গরম হয়ে গেল, কান দুটো টকটকে লাল, কিন্তু হাত হাতের জায়গায়, তখনও কাটাকুটি খেলে যাচ্ছে আর মুখটা বোবা হয়ে গেছে।

চল্লিশ মিনিট কেটে গেছে, ঘন্টা পড়ে গেলো। অংকের ক্লাস শেষ। পরের ক্লাস পদার্থ বিজ্ঞান। ওদের স্যার কেমিস্ট্রি ল্যাবে নিয়ে গিয়ে কিছু ছোট ছোট এক্সপেরিমেন্ট দেখিয়েছেন। বেশ মজা হয়েছে সূর্যর। সত্যি বইয়ের পড়াগুলো এরকম হাতে করে দেখলে কত সহজেই ও বুঝে যায়। পুরো দুটো ক্লাস ধরে স্যার ওদের রঙিন জিনিস পত্র দেখিয়ে বুঝিয়ে পড়ার ইচ্ছাটাই জাগিয়ে তুলেছেন। ল্যাব থেকে বেরিয়েই ওদের ক্লাসরুমের দিকও দৌড়োলো। আজ মা টিফিনে চাউমিন দিয়েছে, গিয়েই খেতে হবে। কিন্তু যতক্ষণে ও পৌছালো ততক্ষনে ওর ব্যাগ থেকে টিফিন বেঞ্চে বেরিয়ে পড়েছে, ঋষব আর ওর বন্ধুদের অশেষ কৃপায়। ঋষব টিফিন থেকে এক খামচে অর্ধেকটা চাউমিন তুলে মুখে পুরে দিলো আর বাকি অংশটুকু ওর বন্ধুরা খেতে আরম্ভ করেছে।

“এই তোরা আমার টিফিন খেলি কেন?”

“একটুই তো খেয়েছি, তাতে কি হয়েছে?”, ঢেঁকুর তুলতে তুলতে ঋষব বলে ওঠে।

“পুরোটাই তো শেষ করে দিলি!”

“তুই কি স্বার্থপর রে ভানু, আমরা একটু খেয়েছি কি খাইনি অমনি রেগে গেলি!”

এদের সাথে ঝগড়া করে লাভ নেই, পুরো রাক্ষসের দল, মনে মনে বলে সূর্য। টিফিন বাক্সটা নিয়ে বারান্দায় এসে দেখে, নাহ, কিছুই প্রায় নেই, আজ না খেয়েই থাকতে হবে। বারান্দার অন্য প্রান্তে রাইকে আইসক্রিম খেতে দেখে সূর্যর মনটা আবার ভালো হয়ে যায়। তৃষার সাথে রাই গল্প করছে, হাসছে, আবার কথা বলছে, ওর সরু সরু গোলাপী ঠোঁটের ভেতরে দুটো গজ দাঁতের মিষ্টি হাসিটা দেখলেই সূর্যর ছোট্ট বুকে অজানা অনুভূতির ঢেউ ওঠে, কেন ওঠে সেটা ক্লাস এইটের সূর্য বুঝে উঠতে পারে না। এইসব কথা ও কাউকে বলতেও পারে না, বন্ধু তো একটাও নেই, মা বাবা জানতে পারলে মেরে ঠ্যাং ভেঙে দেবে, একমাত্র ভরসা দিদি। দিদির কথা এলেই ওর মনটা চাঙ্গা হয়ে ওঠে, ওই একজনই আছে যে ওর কথার গুরুত্ব দেয়, ওর সাথে ওর মতো করে কথা বলে আর নির্দ্বিধায় ঝগড়াও করতে পারে। দিদির কথা মনে পড়তেই সূর্যর মনে পড়ে গেলো, আজ দিদির জন্যে আলুর চপ কিনে নিয়ে যেতে হবে আর দিদিও চিকেন কাটলেট নিয়ে আসবে; সন্ধ্যেবেলায় দিদির ঘরে খেতে খেতে ও রাইয়ের কথা দিদিকে বলবে।

আবার ঘন্টা বাজলো। টিফিনের সময় শেষ। এবার ভূগোলের ক্লাস কিন্তু স্যার ছুটি নিয়েছেন। তাই এখনও ক্লাসের ছেলেমেয়েরা বারান্দায় গল্প করে যাচ্ছে। সূর্যর ও ইচ্ছা করলো না পড়াশোনা করতে। অন্য দিকে রাই টিফিন শেষ করে ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়িয়েছে। সূর্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাই মৃদু হাসলো। সেই মুক্ত ঝড়ানো হাসি সূর্যর মনে উথাল পাথাল ঢেউ তুলে দিয়েছে। মনে মনে একটু যেন লজ্জা পেয়ে গেল সূর্য।

হঠাৎ সূর্যর পেছনে পদাঘাত করলো কেউ। ঘুরে দেখল ওটা সৃজনের কাজ। “ভা-নু খ্যা-পা!”, বলে চেঁচাতে লাগলো ও, তাও আবার রাইএরই সামনে। সূর্যর মাথা গরম হয়ে গেল, কিছু না ভেবেই সৃজনকে টেনে মারলো একটা চড়। সৃজনের চোখ থেকে ওর চশমাটা খুলে ছিটকে পড়ে গেলো রাইয়ের পায়ের কাছে। ঋষব এন্ড কোম্পানি বাকশূন্য! সৃজন ঘটনার আকস্মিকতার ঘোরে আচ্ছন্ন। মেয়েগুলো খিলখিল করে হাসছে। আর রাই অবাক হয়ে বলে উঠল, “সূর্য!”

স্কুলের হেডস্যার তখন পাশের ক্লাসে পড়াতে যাচ্ছিলেন, এত হাসির আওয়াজ শুনে চলে এলেন ক্লাস এইটের ঘরের সামনে। সূর্য চড় মেরেছে শুনে একটা ক্লাসের জন্যে ওকে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি দিলেন আর বাকিদের ভূগোলের প্রশ্নের উত্তর লিখতে দিলেন। শাস্তি পেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্যর মনে হলো, অনেক দিনের ক্ষোভ, দুঃখ আর রাগ এক নিমেষে ওর মন থেকে বেরিয়ে গেল। বহুদিনের জমে থাকা রিপুগুলো থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার মুক্তি বোধহয় এতটাই শান্তি দেয়! ভবিষ্যতে কেউ ভানু বলে ডাকলে এই লোমহর্ষক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে কেউ আর আশ্চর্য হবে না।

ক্লাসের জানলা দিয়ে দেখলে, একদম প্রথমে রাইকেই দেখা যায়। ভূগোলের প্রশ্নের উত্তর লিখতে লিখতে মাঝে মাঝেই রাই অন্যমনস্ক হয়ে সূর্যকে দেখছে আবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। নির্বোধ সূর্য ওকে দেখে ফেললো কিনা কে জানে! শুধুমাত্র সূর্য জানে যে ও রাইকে দেখেছে ওর দিকে তাকাতে। নাহ, আজ সত্যি দিদির জন্যে দুটো আলুর চপ বেশি করে কিনে নিয়ে যেতে হবে, ভুলে গেলে একদমই চলবে না কারণ সূর্যর মনের ভেতর সুপ্ত সমস্যাটার সমাধানের আসন্ন প্রয়োজন আর সেটা দিদি ছাড়া আর কেউ পারবেও না!

Advertisements

2 thoughts on “নির্বোধের একদিন

  1. Khub sundor, Bangla Vasa are banglavasar Chanda, sob ki6u nikhud hoye6e. But story ta ektu short & uncommon hole aro valo lagto. Tobe, first time….lekha wasom. Keep going…next time aro valo chai.

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s